ইলবার্ট বিল কি? আন্দোলন,রচনা,পাস ও গুরুত্ব

ইলবার্ট বিল কি ? আন্দোলন,রচনা,পাস ও গুরুত্ব


আজ আমরা জানব ইলবার্ট বিল কি (ilbert bill in bengali), কে রচনা করেন, কে পাস করেন, এর গুরুত্ব, ইলবার্ট বিল আন্দোলন নিয়ে বিশদে।

ভুমিকা

১৮৭৩ সালে ভারত ছিল ইংরেজদের অধীন উপনিবেশ । ভারতের বিচার ব্যাবস্থার পুরোটায় ছিল ইংরেজদের নিয়ন্ত্রাধীন । এই সময়কার অর্থাৎ ১৮৭৩ সালের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কোনো ভারতীয় বিচারক ইংরেজদের বিচার করতে পারতো না। তাদের সেই ক্ষমতা ছিলোনা। ইংরেজদের বিচার করতো শুধুমাত্র ইংরেজ বিচারপতিরা।

মৃত্যু বা পরিবহন সংক্রান্ত যেকোনো বিচারই একমাত্র উচ্চ আদালতে হতো।

ইলবার্ট বিল চালু হওয়ার পরই এই পুরো ব্যাপারটায় তুমুল পরিবর্তন হয়ে যায়

কারন,সিভিল সার্ভিসে যে সব অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যাক্তিরা ছিলেন তারা এবার উচ্চ আদালত ছাড়াও নিজের মতো রায় দিতে পারতেন  মৃত্যু বা পরিবহন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

ভারতীয় বিচারকদের ইংরেজদের সমান মর্যাদা দেওয়ার ফলে ইলবার্ট  বিল তুমুল বিতর্কের কারন হয়ে দাঁড়ায়।

ইলবার্ট বিল কি (ilbert bill in bengali )

ইলবার্ট-বিল-কি-আন্দোলন

ব্রিটিশ ভারতের বিচার ব্যাবস্থায় ভারতীয় বিচারকদের প্রতি এরকম জাতিভেদ মুলক বৈষম্য দূর করার উদ্দেশে তৎকালীন বড়লাট বা ভাইসরয় লর্ড রিপনের পরামর্শে তার কাউন্সিলের আইন বিভাগের সদস্য ইলবার্ট (Sir Courtenay Peregrine Ilbert) ১৮৮২ সালে একটি খসড়া বিল ” Bill to amend the Code of Criminal Procedure, 1882 ” তৈরি করেন ।

এই খসড়া বিলটি 9 February 1883 সালে আইনত প্রকাশিত হয়, যা ইলবার্ট বিল নামে ইতিহাসের পাতায় খ্যাত হয়ে আছে ।

ইলবার্ট বিল কে রচনা করেন

ইলবার্ট বিলটি ১৮৮২ সালে স্যার কর্টনেয় পেরজিন ইলবার্ট (Sir Courtenay Peregrine Ilbert) রচনা করেন।পুরো খসড়াটির নাম ছিল ” Bill to amend the Code of Criminal Procedure, 1882 “। স্যার ইলবার্ট ছিলেন একজন ব্রিটিশ আইনজীবী ও civil servant, যিনি বহু বছর ভাইরয়ের কাউন্সিলে (Viceroy of India’s Council) আইন পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করেছিলেন।

ইলবার্ট বিল কে পাস করেন

ইলবার্ট বিল বড়োলাট লর্ড রিপন ১৮৮২ সালের Bill to amend the Code of Criminal Procedure, 1883 সালের 9 February পাস করেন।

এর মূল উদ্দেশ্য

ব্রিটিশ ভারতের বিচার ব্যাবস্থায় ভারতীয় বিচারকদের প্রতি জাতিভেদ মুলক বৈষম্য দূর করা

ইলবার্ট বিল আন্দোলন

  • ইলবার্টের খসড়াটি  আইন হয়ে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে জোরালো আন্দোলন শুরু করে,এর মুল কারণ ছিল এই খসড়া আইনটি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হওয়ার পর ভারতীয় বিচারকরাও ইউরোপীয়দের বিচার করতে পারতেন এবং সেক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা ইউরোপীয় বিচারকদের সমান সমান হতো।
  • ইলবার্ট বিলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয়দের এই আন্দোলন শ্বেতাঙ্গ বিদ্রোহ বা  White Mutiny নামে খ্যাত ।
  • এই বিলে গ্রিফিথ ইভান্সের নেতৃত্বে বাংলায় ব্রিটিশ চা বাগান মালিক এবং নীলকর সাহেবদের নিয়ে গঠিত কলকাতা ইউরোপীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল।
  • ইংরেজী মহিলা জড়িত কোনো মামলা মোকাবিলায় ভারতীয় বিচারকদের বিশ্বাস করা যায় না এমন  ধরনের প্রচার ইলবার্ট বিল আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জোগাতে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল।
  • বিলটি ফিরিয়ে নেবার জন্য ব্রিটিশ আইনজীবী কেসুয়িক, মিলার ব্রানসন -এর নেতৃত্বে ‘ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে এক সংস্থা গঠন করে আন্দোলন চালায় ।
  • ভারতের বিভিন্ন স্থানে তারা শাখা স্থাপন করে এবং ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে ।
  • তারা এই অভিমত প্রকাশ করেন যে, ইউরোপীয়দের সঠিক বিচার করার যোগ্যতা ও উপযুক্ত ক্ষমতা কোনোটায় ভারতীয়দের নেই ।
  • সমকালীন বিভিন্ন ইউরোপীয় পত্রিকা এমনকি সেই সময়কার বিখ্যাত ‘স্পেকটেটর’ ও ‘টাইমস’ পত্রিকাও এই বিলের নিয়ে ভীষণ সমালোচনা করে ।

ভারতীয়দের প্রতি আন্দোলন

এই বিলের পক্ষে ভারতীয় দের পক্ষথেকে সবচেয়ে বড়ো ভুমিকা নিয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ।তার নেতৃত্বে গঠিত ভারতসভা প্রতিআন্দোলন এই বিলের সমর্থনে সংবাদ পত্রে মতামত জানাতে থাকে।

বেশিরভাগ ব্রিটিশ এই বিলটির বিরোধিতা করায় ভাইসরয় রিপন সংশোধনী বিল আনেন যা ছিল ইল বিলকে অকৃতকার্য করার সামিল। সংশোধনে বলা হয় কোনও ভারতীয় বিচারক যদি কোনও ইউরোপীয়কে ডক-আপের মুখোমুখি হন তবে 50% ইউরোপীয়দের জুরির প্রয়োজন হবে।

এর ফলে পরে ব্রিটিশ এবং ভারতীয়দের মধ্যে বিরোধিতা আরও গভীর আকার নেয়। যার ফলে পরবর্তীকালে ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়।

গুরুত্ব

ভারতের ইতিহাসে পুরো ঘটনাটির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

১. দেশপ্রেমের জাগরণ – 

দেশের মানুষদের অপমান ভারতীয়দের তাদের নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা অনেক বেশি বৃদ্ধি ঘটায়

২. সচেতনটা বৃদ্ধি

এই বিলটি ভারতীয়দের সম্পর্কে ইংরেজদের মনোবৃত্তি ও ধারনা পুরোটায় প্রকাশ ঘটায় ফলে ভারতীয়রা নিজেদের ব্যাপারে সচেতন হন

৩. সংঘটিত হয়ে থাকা

এর ফলে ভারতীয়রা নিজেরা সংঘটিত হয়ে থাকতে শুরু করে করে

৪. জাতীয়তাবাদী সংগঠনের জন্ম

এই সময় বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী সংঘটন গড়ে ওঠে। যেমন –

  • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেস
  • ফিরোজ শাহের নেতৃত্বে বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশান
  • বীর রাঘবাচারির নেতৃত্বে মহাজন সভা

৫. ব্রিটিশ বিরোধিতা বৃদ্ধি

এর পরে ব্রিটিশদের সাথে ভারতীয়দের একটা বিভাজনের ও দূরত্বের রেখা তৈরি করে।

সবশেষে,

আজ আমরা জানলাম ইলবার্ট বিল কি (ilbert bill in bengali), কে রচনা করেন, কে পাস করেন, এর গুরুত্ব, ইলবার্ট বিল আন্দোলন নিয়ে বিশদে।

এটা বলা চলে এই বিলটি থেকেই জাতীয়তা বোধ বিষয়টির উপর ভারতীয়দের বেশি প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ,যা এতদিন খাতায় কলমেই আবদ্ধ ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *